আমি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত!

 ধরো আমার দুই বন্ধু, রাম ও রহিম। রাম বেশ খোলামেলা প্রকৃতির, সবার সঙ্গেই চট করে মিশতে পারে, ওর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও অনেক; অন্যদিকে রহিম একটু অন্তর্মুখী প্রকৃতির, সবার সাথে চট করে মিশতে পারে না, আমাকে ছাড়া ওর তেমন আর কোনো বন্ধু নেই। রাম থাকে যৌথ পরিবারে, বেশ বড়সড় পরিবার, অনেক সদস্য; অন্যদিকে রহিম থাকে ওর মা ও বাবার সাথে একটা বাড়িতে, বুঝতেই পারছো ওদের বাড়িতে তিনজন মাত্র সদস্য। 

 কদিন আগে শুনলাম ওদের মধ্যে একজন ডিপ্রেশন (অবসাদ) ও এংজাইটি (উদ্বেগে) ভুগছে! শুনে খুব বিস্মিত হলাম। তোমরা কি এবার আন্দাজ করতে পারছো, ঠিক কার ডিপ্রেশন হয়েছে? রাম নাকি রহিম? আমার উপরের বর্ণনা শুনে তোমার স্বাভাবিক উত্তর হবে রহিম। এটাই কিন্তু স্বাভাবিক উত্তর। কিন্তু এবার আসল উত্তরটা শুনে তুমিও আমার মতো বিস্মিত হবে। রামের ডিপ্রেশন হয়েছে। অবাক হলে? স্বাভাবিক!

মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগ হল এমন একটা সমস্যা, কার সাথে যে হবে তার কোনো ঠিক নেই। বিভিন্ন পরিবেশগত, জিনগত ইত্যাদি বিষয়ের ওপর এইসব জিনিস নির্ভর করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ২৬৪ মিলিয়ন (সব বয়সের) মানুষ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। কিন্তু দুঃখের কথা প্রায় ৭৬% থেকে ৮০% মানুষ এইসব মানসিক রোগের সঠিক চিকিৎসা করায় না বা পায় না। 



উপরের উদাহরণ থেকে আমাদের ধারনা হয়েছিল যেহেতু রাম সারাদিন ব্যস্ত থাকে এবং অনেক মানুষের মাঝে থাকে তাই তার ডিপ্রেশন হতেই পারে না আবার রহিম যেহেতু সারাদিন একা একা কাটায় তাই তার ডিপ্রেশন হবেই। এবার স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে এই থিওরি সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। 

আবার আজকাল অনেক মানুষকেই দেখা যায়, তারা ধরেই নেয় মানসিক ব্যাধি মানেই পাগল! এগুলো সত্যিই হাস্যকর এবং সাথে সাথে চিন্তিত করার মত বিষয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই উচিত এইসব মানসিক ব্যাধি সম্পর্কে পরিচিতি গড়ে তোলা। এরফলে শিক্ষার্থীরা যদি নিজে আক্রান্ত হয় তাহলে তারা তাড়াতাড়ি অনুধাবন করতে পারবে আবার যদি পরিবারের কেও বা বন্ধুদের কেও এইসব মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে তাদের রোগগুলি দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যাবে। 

এই করোনা লকডাউন কালে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রথমত গৃহবন্দি অবস্থা, মানবসমাজ থেকে অনেক দুরে তার উপর করোনার মতো অতিমারির আতঙ্ক, সাধারণমানুষের জন্য এক নাজেহাল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল।  এরপর আস্তে আস্তে যখন স্কুল, কলেজ খুলবে তখন শিক্ষকদের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের উপর বিশেষ নজর রাখা এবং তাদের মধ্যে কোনো মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে সরাসরি কথা বলে তাদের এই রোগ সম্পর্কে সচেতন করা। তবে তার আগে শিক্ষকদের মানসিক রোগ সম্পর্কে একটা সম্যক ধারনা থাকা প্রয়োজন, নাহলে দেখা যাবে পেট ব্যথা নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চলে গেছে। 

শিক্ষকগন এইসব ব্যপারে বিস্তারিত জানতে ইন্টারনেট পাড়ার সাহায্য নিতেই পারে, সেখানে অনেক ভালো ভালো তথ্য উপস্থিত আছে, তবে ভুয়ো তথ্যের থেকেও সাবধান থাকতে হবে নাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে। 


 

এবার এই ডিপ্রেশন ও এংজাইটি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলব। প্রায় পুরো লকডাউন যাবত আমি একেবারে বিশাল রকমের ডিপ্রেশন ও এংজাইটিতে আক্রান্ত ছিলাম। তবে আমার ক্ষেত্রে এইসব রোগগুলি বেশ কয়েকবছর আগের থেকেই মৃদুভাবে উপস্থিত ছিল তবে, সেটার উপস্থিতি আমি অনুধাবন করতে পারিনি। শেষমেশ যখন লকডাউন সময়ে রোগগুলি বিকট রূপ ধারণ করে তখন তাদের উপস্থিতি আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। সেই লকডাউন সময়েই দ্রুত চিকিৎসকের খোঁজ করে আমি অবস্থার কথা তাকে খুলে বলি - তিনি আমাকে বেশ কিছু ঔষধ দেন। ঔষধ খাওয়ার পর থেকে আমার অবস্থার উন্নতি হয়। এখন প্রায় বেশ কয়েকমাস পেরিয়ে গেছে, ঔষধ এখনো চলছে তবে এখন বলা যায় অনেকটাই সুস্থ আমি। আগে আমার কোনো কাজ করতে মন চাইত না - লেখালেখি তো দুরের কথা, সফটওয়্যার/অ্যাপস তৈরিও ছেড়েই দিয়েছিলাম। নিজের মনকে বিষণ্ণতা থেকে দুরে রাখতে বেছে নিয়েছিলাম ইন্টারনেটকে। আমার মনে তখন যদি আমার আইকিউ টেস্ট করা হত তাহলে তার ফল আসতো সাধারণের থেকেও নিচে। তবে এখন অবস্থার অনেক অনেক উন্নতি হয়েছে, দেখতেই পাচ্ছ লেখা লেখিও শুরু করেছি গত বছরের শেষদিক থেকে। এখন মাঝে মাঝে কবিতাও লিখি, কয়েকটা গল্পও লিখে ফেলেছি, একটা গল্প অনুবাদেরও কাজ চলছে। চিন্তাভাবনারও ক্ষমতাও পুরো ফিরে পেয়েছি , নতুন নতুন বই পড়ারও উৎসাহ পাচ্ছি। মোটের উপর বলতে গেলে ঔষধের দৌলতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছি। 


 

এখানের আমার অভিজ্ঞতার কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যাতে কেও হাল না ছেড়ে দেয়। নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল তুমি নিজেই। নিজের শরীর ও মন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নাহলে শরীরে বা মনে বাসা বাঁধতে পারে জটিল ব্যাধি। নিজের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেই সাবধান হয়ে যাবে, আর যত দ্রুত সম্ভব নিজের মা-বাবা বা অভিভাবকের সাথে এ নিয়ে কথা বলবে, তারা তোমাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। 

নিজের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করাটা আসলে কিন্তু অতটা সহজ নয়, সহজ হলে আমার ডিপ্রেশন কোনোদিনই বিকটরূপ ধারণ করতো না। যাইহোক আমি এখন একটা নিজস্ব "টেকনিক" ব্যবহার করি নিজের মধ্যে পরিবর্তন ও সাথে সাথে নিজের ভুল ত্রুটিগুলিকে খুঁজে বার করার জন্য - 

প্রতিদিন রাতে বিছানায় শোবার পর, সারাদিন ঠিক কী কী করেছ, নিজের মনে মনেই আলোচনা করবে। এবার বিবেক দিয়ে ভাবার চেষ্টা করবে, তুমি যে যে কাজগুলি করেছ সেগুলি কি ঠিক নাকি ভুল; তোমার আজকের কাজের সাথে একমাস আগের কাজের মধ্যে কী কী পার্থক্য। এইসব নিজের মনের মধ্যেই আলোচনা করবে। তবে নিজের সাথে নিজে সবসময় সৎ থাকার চেষ্টা, তুমি পৃথিবীর সবাইকে ঠকাতে পারো কিন্তু কোনদিন নিজেকে ঠকাতে পারবে। আজ, নাহয় কাল কিম্বা দশ বছর পর হলেও তোমার বিবেক কিন্তু তোমার কর্মের জন্য তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করবে। 

[সব স্থিরচিত্রগুলি Freepik থেকে]

হাজার হাজার মানুষ আজ আক্রান্ত/ শরীরের ব্যাধি নয় / সে যে মনের ব্যাধি

~ পলাশ বাউরি

মন্তব্য

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সংরক্ষণ দ্বন্দ্ব!

নবীন বরণ